বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে বাজারের
ধরন, শেয়ারের মূল্য ওঠানামা এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার
ধারণা থাকা জরুরি। পাশাপাশি DSE ও CSE-এর কার্যক্রম, বাজারে চাহিদা-সরবরাহের
প্রভাব এবং বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে বিনিয়োগের
সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
কোন ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য রিটার্ন পাওয়া যেতে পারে, কোম্পানির
আর্থিক ফলাফল ও ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স কীভাবে মূল্যায়ন করতে হয় এবং শেয়ারের
মূল্য তুলনামূলকভাবে যুক্তিসঙ্গত কি না এসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে
ডিভিডেন্ড, EPS, P/E, ঋণ, নগদ প্রবাহ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে
বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পোস্ট সূচিপত্রঃ বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম
- শেয়ার বাজার কী, এটি কীভাবে কাজ করে?
- বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম
- বাংলাদেশে শেয়ার বাজারের নিয়ন্ত্রক কে?
- বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করার ধাপ
- শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য কী কী প্রয়োজন?
- শেয়ার কেনা ও বিক্রির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া
- নতুনদের জন্য শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কৌশল
- শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সুবিধা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
- ভালো কোম্পানির শেয়ার নির্বাচন করার উপায়
- শেয়ার বাজারে বিনিয়োগে সাধারণ ভুল এবং সেগুলো এড়ানোর উপায়
- শেয়ার বাজারে লাভ-লোকসান কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
- দীর্ঘমেয়াদি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সফল কৌশল
- শেষকথাঃ বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম
শেয়ার বাজার কী, এটি কীভাবে কাজ করে?
শেয়ার বাজার হলো এমন একটি সংগঠিত আর্থিক বাজার, যেখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির
শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ কেনাবেচা করা হয়। কোনো কোম্পানি শেয়ার ইস্যু করলে
বিনিয়োগকারীরা সেই শেয়ার কিনে কোম্পানির মালিকানায় অংশীদার হতে পারেন।
পরবর্তীতে তারা বাজারে শেয়ারটি অন্য বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করতে পারেন।
শেয়ারের দাম মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার চাহিদা-সরবরাহের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত
হয়। বাংলাদেশে প্রধান দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ হলো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে অনলাইন বিনিয়োগ করার নিয়ম
শেয়ার বাজার কীভাবে কাজ করে?
শেয়ার বাজারের কার্যক্রমকে সহজভাবে দেখলে এটি কোম্পানি → শেয়ার ইস্যু →
বিনিয়োগকারী → ব্রোকার → স্টক এক্সচেঞ্জ → কেনাবেচা → নিষ্পত্তি—এই ধারায় কাজ
করে। প্রথমে কোনো কোম্পানি মূলধন সংগ্রহের জন্য IPO-এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের
কাছে শেয়ার অফার করতে পারে। এরপর বিনিয়োগকারী নিবন্ধিত ব্রোকারের মাধ্যমে
শেয়ার কেনা বা বিক্রির অর্ডার দেন। অর্ডারটি স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং
ব্যবস্থায় যায় এবং ক্রেতা-বিক্রেতার অর্ডার মিললে লেনদেন সম্পন্ন হয়। পরবর্তী
ধাপে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অর্থ ও শেয়ারের নিষ্পত্তি হয়।
১. কোম্পানি শেয়ার বাজারে আসেঃ কোনো কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণ বা
নতুন মূলধন সংগ্রহের জন্য জনগণের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারে। প্রথমবার সাধারণ
বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়াকে IPO বলা হয়। IPO সম্পন্ন ও
তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচার জন্য উপলব্ধ হয়।
বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও সিকিউরিটিজের কার্যক্রম BSEC-এর নিয়ন্ত্রক
কাঠামোর আওতায় থাকে।
২. বিনিয়োগকারী BO অ্যাকাউন্ট খোলেনঃ বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে
বিনিয়োগ শুরু করতে সাধারণত একজন বিনিয়োগকারীকে একটি BO (Beneficiary Owner)
Account খুলতে হয়। এই অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগকারীর শেয়ার ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল
আকারে সংরক্ষিত থাকে। সাধারণত নিবন্ধিত ব্রোকার বা Depository Participant-এর
মাধ্যমে BO অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। এরপর প্রয়োজনীয় অর্থ জমা করে বিনিয়োগকারী
শেয়ার কেনাবেচার জন্য প্রস্তুত হন।
৩. ব্রোকারের মাধ্যমে কেনা-বেচার অর্ডার দেওয়া হয়ঃ BO অ্যাকাউন্ট খোলার
পর বিনিয়োগকারী কোনো শেয়ার কেনার বা বিক্রি করার অর্ডার দিতে পারেন। অর্ডারটি
ব্রোকারের ট্রেডিং সিস্টেমের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জে যায়। বর্তমানে অনেক
ব্রোকার মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট, ফোন বা অন্যান্য অনুমোদিত মাধ্যমে অর্ডার
দেওয়ার সুবিধা দেয়। BSEC-এর নির্দেশিকাতেও ব্রোকার নির্বাচন করে অ্যাকাউন্ট
খোলা এবং ব্রোকারের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়ের অর্ডার দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
৪. ক্রেতা ও বিক্রেতার অর্ডার মিললে ট্রেড হয়ঃ স্টক এক্সচেঞ্জের
স্বয়ংক্রিয় ট্রেডিং ব্যবস্থায় ক্রেতার Buy Order এবং বিক্রেতার Sell Order-এর
মূল্য ও পরিমাণ মিললে লেনদেন সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ আপনি যদি নির্দিষ্ট দামে একটি
শেয়ার কিনতে চান, একই বা উপযুক্ত দামে কোনো বিক্রেতার অর্ডারের সঙ্গে মিল তৈরি
হলে আপনার ট্রেড সম্পন্ন হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় বাজারে শেয়ারের দাম ক্রেতা ও
বিক্রেতার চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
৫. ট্রেড সম্পন্ন হওয়ার পর নিষ্পত্তি হয়ঃ শেয়ার কেনা বা বিক্রির অর্ডার
ম্যাচ হওয়ার পরই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয় না; এরপর clearing ও settlement
প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ক্রেতার অর্থ এবং বিক্রেতার সিকিউরিটিজ নির্ধারিত নিয়ম
অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হয়। BSEC-এর বিনিয়োগ নির্দেশিকায় ট্রেডের পর contract
note, অর্থ ও সিকিউরিটিজের settlement সম্পর্কেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে
একটি সফল ট্রেডের পর বিনিয়োগকারীর BO অ্যাকাউন্টে কেনা শেয়ার এবং সংশ্লিষ্ট
লেনদেনের হিসাব প্রতিফলিত হয়।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের প্রধান লাভ
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা
পাওয়ার সুযোগ পান। এর মধ্যে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি থেকে মূলধনী লাভ, যোগ্য
কোম্পানি থেকে ডিভিডেন্ড, দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়ে তোলার সম্ভাবনা এবং কোম্পানির
ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির অংশীদার হওয়া অন্যতম। এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানি ও
সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য করার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব
সুবিধার পাশাপাশি বাজারে মূলধন হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। তাই বিনিয়োগের আগে
কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, শেয়ারের মূল্য ও সামগ্রিক বাজার
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
১. শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেলে মূলধনী লাভের সুযোগঃ শেয়ার বাজারে
বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মূলধনী লাভ (Capital Gain) অর্জনের সুযোগ।
কোনো কোম্পানির শেয়ার কম দামে কেনার পর ভবিষ্যতে সেই শেয়ারের বাজারমূল্য বেড়ে
গেলে বিনিয়োগকারী বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করতে পারেন। যেমন, ৫০ টাকা দরে কেনা
একটি শেয়ারের দাম ৭০ টাকা হলে প্রতি শেয়ারে ২০ টাকা লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে শেয়ারের দাম সবসময় বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজার পরিস্থিতি বা কোম্পানির
পারফরম্যান্স খারাপ হলে দাম কমেও যেতে পারে।
২. যোগ্য কোম্পানি থেকে ডিভিডেন্ড পাওয়ার সম্ভাবনাঃ কোম্পানি ব্যবসা করে
মুনাফা অর্জন করলে তার একটি অংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ
হিসেবে বিতরণ করতে পারে। কোনো বিনিয়োগকারী একটি যোগ্য কোম্পানির শেয়ার ধরে
রাখলে কোম্পানির ঘোষিত নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নগদ বা বোনাস ডিভিডেন্ড
পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সব কোম্পানি নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয় না এবং
ডিভিডেন্ডের পরিমাণও নির্দিষ্ট নয়। তাই শুধু বেশি ডিভিডেন্ডের আশায় বিনিয়োগ না
করে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, মুনাফা, ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং পূর্বের ডিভিডেন্ড
ইতিহাস বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ তৈরির সুযোগঃ শেয়ার বাজারে ভালো কোম্পানিতে
দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে সময়ের সঙ্গে সম্পদ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একটি
কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুনাফা বৃদ্ধি এবং বাজারে অবস্থান
শক্তিশালী করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে তার শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকতে
পারে। পাশাপাশি ডিভিডেন্ড থেকে পাওয়া অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের
পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই
বিনিয়োগের আগে কোম্পানির মৌলিক আর্থিক তথ্য, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা জরুরি।
৪. কোম্পানির ব্যবসার প্রবৃদ্ধির অংশীদার হওয়ার সুযোগঃ কোনো কোম্পানির
শেয়ার কেনার মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী সেই কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ অর্জন
করেন। ফলে কোম্পানির ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রম ভালোভাবে বৃদ্ধি পেলে
শেয়ারহোল্ডারও তার সম্ভাব্য সুফল পেতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোম্পানি নতুন
বাজারে প্রবেশ করে, বিক্রি বাড়ায় বা মুনাফা বৃদ্ধি করে তাহলে ভবিষ্যতে তার
শেয়ারের মূল্য ও ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এভাবে শেয়ার বাজারের
মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা না করেও একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য
প্রবৃদ্ধিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
৫. বিভিন্ন শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের সুযোগঃ শেয়ার
বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারী বিভিন্ন কোম্পানি ও বিভিন্ন ধরনের
সিকিউরিটিজ বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। বিভিন্ন খাতের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে একটি
নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। এটিকে
বৈচিত্র্যকরণ (Diversification) বলা হয়। বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা,
বিনিয়োগের সময়কাল ও আর্থিক লক্ষ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের ধরন নির্বাচন করা উচিত।
তবে বিভিন্ন শেয়ারে বিনিয়োগ করলেই ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে দূর হয় না; বাজারের
সামগ্রিক পতন হলে একাধিক বিনিয়োগের মূল্যও কমতে পারে।
শেয়ার বাজার কি ঝুঁকিমুক্ত?
না, শেয়ার বাজার ঝুঁকিমুক্ত নয়। শেয়ারের দাম বিভিন্ন কারণে দ্রুত বৃদ্ধি বা
হ্রাস পেতে পারে। কোম্পানির ব্যবসায়িক ফলাফল, মুনাফা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি,
সুদের হার, শিল্পখাতের পরিবর্তন, বাজারের চাহিদা-সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ
শেয়ারের মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারী যেমন লাভ করতে পারেন, তেমনি
মূলধনের একটি অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ হারানোর ঝুঁকিও থাকতে পারে। তাই BSEC
বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করার
পরামর্শ দেয়।
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকা
জরুরি। বিনিয়োগ শুরু করতে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রথমে একটি
উপযুক্ত ও অনুমোদিত ব্রোকার নির্বাচন করে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। এরপর CDBL-এর
মাধ্যমে BO Account তৈরি করে বিনিয়োগের জন্য অর্থ প্রস্তুত করতে হয়। তারপর
কোম্পানি সম্পর্কে তথ্য ও আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে শেয়ার নির্বাচন করা হয়।
সবশেষে ব্রোকারের মাধ্যমে Buy Order দিয়ে ট্রেড সম্পন্ন করা এবং নিজের বিনিয়োগ
নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
১. নিবন্ধিত ব্রোকার নির্বাচন করুনঃ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের প্রথম ধাপ
হলো একটি BSEC-নিবন্ধিত স্টক ব্রোকার নির্বাচন করা। ব্রোকারের মাধ্যমে
বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনা-বেচার অর্ডার দিতে পারেন। তাই ব্রোকার নির্বাচনের আগে
তার নিবন্ধন, সেবার মান, ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, চার্জ এবং গ্রাহকসেবা সম্পর্কে
যাচাই করা ভালো। BSEC-এর বিনিয়োগ নির্দেশিকায়ও বিনিয়োগকারীদের ব্রোকার
নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলা
হয়েছে।
২. BO Account খুলুনঃ বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য নিজের
নামে BO Account বা BO ID থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগকারীর কেনা
সিকিউরিটিজ ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। BSEC-এর সাম্প্রতিক নির্দেশনায়
স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য BO ID থাকা আবশ্যক এবং এটি
নিবন্ধিত স্টক ব্রোকার বা ডিপোজিটরি পার্টিসিপেন্টের মাধ্যমে খোলা হয়। শেয়ারের
মালিকানা ও লেনদেন সঠিকভাবে নিজের BO অ্যাকাউন্টে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা সেটিও
নিশ্চিত করা উচিত।
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দিনঃ ব্রোকারের কাছে অ্যাকাউন্ট খোলার
সময় বিনিয়োগকারীর পরিচয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়। BSEC-এর
বিনিয়োগ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের পরিচয় প্রমাণসহ প্রয়োজনীয়
ডকুমেন্টেশন দিয়ে ব্রোকারের কাছে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং একটি অ্যাকাউন্ট বা
রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিতে হবে। সঠিক তথ্য ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিজের
নামে সঠিকভাবে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করলে লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতে
কোনো সমস্যা হলে তা সমাধান করা সহজ হয়।
৪. বিনিয়োগের জন্য অর্থ জমা করুনঃ অ্যাকাউন্ট খোলার পর শেয়ার কেনার জন্য
প্রয়োজনীয় অর্থ ব্রোকারের নির্ধারিত পদ্ধতিতে জমা করতে হয়। বিনিয়োগের আগে
নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত। BSEC-এর
বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং
পুঁজিবাজারের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য রিটার্ন সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া
হয়েছে। তাই ধার করা অর্থ বা জরুরি প্রয়োজনের টাকা দিয়ে বিনিয়োগ না করে নিজের
সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ বিনিয়োগ করা তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ পদ্ধতি।
৫. কোম্পানি বিশ্লেষণ করে শেয়ার নির্বাচন করুনঃ শুধু শেয়ারের দাম কম বা
বেশি এটি দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিনিয়োগের আগে কোম্পানির
আর্থিক ফলাফল, মুনাফা, EPS, NAV, ডিভিডেন্ড ইতিহাস, ঋণের পরিমাণ, ব্যবসার ভবিষ্যৎ
সম্ভাবনা এবং খাতের অবস্থা বিশ্লেষণ করা ভালো। BSEC-এর Investor Education
Program-এও বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, প্রসপেক্টাস বিশ্লেষণ, সেকেন্ডারি মার্কেটে
বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো শেখানো হয়। অর্থাৎ
তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ব্রোকারের মাধ্যমে Buy Order দিনঃ কোনো শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার
পর বিনিয়োগকারী ব্রোকারের মাধ্যমে Buy Order দিতে পারেন। অর্ডারে সাধারণত কোন
কোম্পানির কতটি শেয়ার এবং কী দামে কেনা হবে তা নির্ধারণ করা হয়। BSEC-এর
নির্দেশিকা অনুযায়ী, অর্ডার দেওয়ার পর বিনিয়োগকারীর অর্ডার কনফার্মেশন এবং
ট্রেড সম্পন্ন হলে ট্রেড কনফার্মেশন পাওয়া উচিত। ট্রেড সম্পন্ন হওয়ার পর
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে Contract Note-ও পাওয়ার কথা।
৭. ট্রেড ও Contract Note যাচাই করুনঃ শেয়ার কেনা বা বিক্রির পর লেনদেনের
তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। BSEC-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, অর্ডার দেওয়ার পর
Order Confirmation Slip, ট্রেড সম্পন্ন হলে Trade Confirmation Slip এবং
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে Contract Note পাওয়া উচিত। Contract Note-এ সাধারণত
লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। বিনিয়োগকারীর নিজের স্বার্থে শেয়ারের পরিমাণ,
মূল্য, ব্রোকারেজ ও অন্যান্য তথ্য সঠিক আছে কিনা যাচাই করা ভালো। কোনো অসঙ্গতি
থাকলে দ্রুত ব্রোকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
৮. শেয়ার নিজের BO Account-এ আছে কিনা দেখুনঃ শেয়ার কেনার পর
বিনিয়োগকারীর নিজের নামে পরিচালিত BO Account-এ সংশ্লিষ্ট শেয়ার সঠিকভাবে
প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। BSEC-এর ২০২৫ সালের
সতর্কবার্তায় বিনিয়োগকারীদের বিশেষভাবে এ বিষয়টি যাচাই করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে CDBL-এর Central Depository System ইলেকট্রনিকভাবে সিকিউরিটিজের
মালিকানা, স্থানান্তর এবং নিষ্পত্তির রেকর্ড সংরক্ষণ করে। তাই শেয়ার কেনার পর BO
Account-এর তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা নিরাপদ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার একটি
গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৯. শেয়ার বিক্রি করতে Sell Order দিনঃ কোনো শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে
বিনিয়োগকারী ব্রোকারের মাধ্যমে Sell Order দিতে পারেন। শেয়ারের বর্তমান
বাজারমূল্য, কোম্পানির পরিস্থিতি এবং নিজের বিনিয়োগ লক্ষ্য বিবেচনা করে বিক্রির
সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। শেয়ার বিক্রির পর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সিকিউরিটিজ ও
অর্থের নিষ্পত্তি হয়। BSEC-এর নির্দেশিকায় বিক্রির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে
প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ সময়মতো সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট settlement প্রক্রিয়া
অনুসরণ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১০. ঝুঁকি বুঝে বিনিয়োগ করুনঃ সবশেষে মনে রাখতে হবে, শেয়ার বাজারে
বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। শেয়ারের দাম কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, অর্থনীতি, সুদের
হার, বাজারের চাহিদা-সরবরাহ এবং বিভিন্ন তথ্যের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই
কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারে পুরো অর্থ বিনিয়োগ না করে নিজের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা
অনুযায়ী পোর্টফোলিও তৈরি করা যেতে পারে। BSEC-এর Investor Education Program-ও
বিনিয়োগের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য রিটার্ন, আর্থিক পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ বিশ্লেষণ
সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারের নিয়ন্ত্রক কে?
বাংলাদেশের শেয়ার বাজার বা পুঁজিবাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো বাংলাদেশ
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)। সংস্থাটি ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়
এবং দেশের সিকিউরিটিজ বাজারের সুষ্ঠু পরিচালনা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। BSEC-এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ,
পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। শেয়ার বাজারে
কোম্পানি, বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম
নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে রাখতেও BSEC গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
BSEC বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও
তদারকি করে। সংস্থাটি স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংকার, মিউচুয়াল
ফান্ডসহ বিভিন্ন বাজার মধ্যস্থতাকারীকে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখে। একই
সঙ্গে শেয়ার বাজারে প্রতারণা, কারসাজি, অন্যায্য লেনদেন এবং ইনসাইডার
ট্রেডিংয়ের মতো অনিয়ম প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে পারে। নতুন সিকিউরিটিজ ইস্যু,
বাজারের নিয়ম-কানুন এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও BSEC গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বাজারের
স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জ রয়েছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ
(DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)। এসব স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত
কোম্পানির শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ কেনাবেচা হয়। DSE ও CSE তাদের নিজস্ব
ট্রেডিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে
BSEC তাদের কার্যক্রম তদারকি করে। স্টক এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন নিয়ম ও কার্যক্রম
BSEC-এর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। ফলে বাজারে সুশৃঙ্খল ও ন্যায্য
লেনদেন নিশ্চিত করতে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করার ধাপ
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুসরণ
করতে হয়। সাধারণভাবে ব্রোকার নির্বাচন → BO Account খোলা → প্রয়োজনীয় তথ্য ও
অর্থ জমা → কোম্পানি বিশ্লেষণ → Buy Order → ট্রেড সম্পন্ন → শেয়ার
পর্যবেক্ষণ—এই প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ শুরু করা যায়। CDBL-এর তথ্য অনুযায়ী,
বিনিয়োগকারী যেকোনো CDBL Participant-এর মাধ্যমে BO Account খুলতে পারেন এবং
অনলাইনেও BO Account খোলার সুবিধা রয়েছে।
১. একটি নিবন্ধিত ব্রোকার নির্বাচন করুনঃ প্রথমে একটি অনুমোদিত ও
নির্ভরযোগ্য স্টক ব্রোকার বা CDBL Participant নির্বাচন করতে হবে। ব্রোকারের
মাধ্যমে শেয়ার কেনা-বেচার অর্ডার দেওয়া হয় এবং আপনার BO Account পরিচালিত হয়।
ব্রোকার নির্বাচনের সময় তার ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, ব্রোকারেজ চার্জ, গ্রাহকসেবা,
গবেষণা সুবিধা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনা করা ভালো। CDBL-এর তথ্য অনুযায়ী,
বিনিয়োগকারীরা যেকোনো CDBL Participant-এর সঙ্গে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন।
২. BO Account খুলুনঃ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য BO (Beneficiary
Owner) Account অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অ্যাকাউন্টে আপনার কেনা শেয়ার
ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। CDBL-এর মাধ্যমে অনলাইন BO Account খোলার সুবিধাও
রয়েছে। অনলাইন আবেদনের জন্য সাধারণত বৈধ মোবাইল নম্বর, NID/Smart Card, ব্যাংক
অ্যাকাউন্টের তথ্য, ছবি ও স্বাক্ষরের মতো তথ্য প্রয়োজন হয়।
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি প্রস্তুত করুনঃ BO Account খোলার আগে
প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি প্রস্তুত রাখা উচিত। CDBL-এর অনলাইন BO Opening System
অনুযায়ী, বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে বৈধ NID/Smart Card, মোবাইল নম্বর,
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, ডিজিটাল ছবি ও স্বাক্ষর প্রয়োজন হতে পারে। অনলাইন
আবেদনের সময় OTP যাচাই এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের ব্যবস্থাও রয়েছে।
৪. বিনিয়োগের জন্য অর্থ প্রস্তুত করুনঃ BO Account ও ট্রেডিং সুবিধা চালু
হওয়ার পর বিনিয়োগের জন্য অর্থ প্রস্তুত করতে হবে। শুরুতেই বড় অঙ্কের টাকা
বিনিয়োগ না করে নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী পরিমাণ
নির্ধারণ করা ভালো। শেয়ার বাজারে লাভের নিশ্চয়তা নেই এবং বাজারমূল্য কমে গেলে
ক্ষতি হতে পারে। তাই দৈনন্দিন খরচ, জরুরি তহবিল বা ঋণের টাকা ব্যবহার না করে
বিনিয়োগের জন্য আলাদা অর্থ নির্ধারণ করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পদ্ধতি।
৫. বিনিয়োগের আগে কোম্পানি বিশ্লেষণ করুনঃ শেয়ার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট
কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক ফলাফল, মুনাফা, EPS, ঋণ, ডিভিডেন্ডের ইতিহাস এবং
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া উচিত। শুধু শেয়ারের দাম কম দেখে কোনো
কোম্পানিকে ভালো বিনিয়োগ মনে করা ঠিক নয়। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব
বা কারও “নিশ্চিত লাভ” দেওয়ার দাবির ওপর নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ। কোম্পানির
প্রকাশিত তথ্য ও নির্ভরযোগ্য বাজার-তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
৬. Buy Order দিনঃ কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর
ব্রোকারের ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে Buy Order দিতে হয়। সেখানে নির্দিষ্ট
শেয়ার, কতটি শেয়ার কিনবেন এবং কোন দামে কিনতে চান এসব তথ্য নির্বাচন করা হয়।
আপনার Buy Order-এর সঙ্গে কোনো বিক্রেতার Sell Order-এর মূল্য ও পরিমাণ মিললে
ট্রেড সম্পন্ন হতে পারে। অর্ডার দেওয়ার আগে শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য এবং
নিজের নির্ধারিত বিনিয়োগ সীমা যাচাই করা উচিত।
৭. ট্রেড সম্পন্ন হয়েছে কিনা যাচাই করুনঃ Buy Order দেওয়ার পর অর্ডারটি
সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা অবশ্যই যাচাই করতে হবে। অর্ডার সম্পন্ন হলে আপনার ট্রেডিং
অ্যাকাউন্টে লেনদেনের তথ্য দেখা যাবে। CDBL-এর ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীর
সিকিউরিটিজ অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত থাকে এবং অ্যাকাউন্টের লেনদেনের বিবরণী পাওয়ার
ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই শেয়ারের সংখ্যা, কেনার মূল্য এবং লেনদেনের অন্যান্য তথ্য
সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. BO Account নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুনঃ শেয়ার কেনার পর BO Account এবং
বিনিয়োগের পোর্টফোলিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। আপনার কেনা শেয়ারের সংখ্যা,
কর্পোরেট অ্যাকশন, ডিভিডেন্ড বা অন্যান্য পরিবর্তন সম্পর্কে নজর রাখুন। CDBL
বিনিয়োগকারীদের জন্য Balance Inquiry, SMS Alert এবং Email Notification-এর মতো
বিভিন্ন সেবা প্রদান করে। ফলে আপনার সিকিউরিটিজ ও লেনদেনের তথ্য নিয়মিত যাচাই
করা সম্ভব।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য কী কী প্রয়োজন?
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করতে কিছু আইনি, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক
প্রস্তুতি প্রয়োজন। সাধারণ বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে নিজের নামে BO Account, বৈধ
NID/Smart Card, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল নম্বর, প্রয়োজনীয় ছবি ও স্বাক্ষর
এবং বিনিয়োগের জন্য অর্থ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। CDBL-এর বর্তমান অনলাইন BO Account
Opening System-এ এসব তথ্য ও নথির বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় হিসেবে উল্লেখ করা
হয়েছে।
১. বৈধ NID বা Smart Card: শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য নিজের নামে একটি
বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা Smart Card থাকা প্রয়োজন। CDBL-এর অনলাইন BO
Account Opening System বর্তমানে ১০ ডিজিট ও ১৭ ডিজিটের NID গ্রহণ করে। NID-এর
তথ্য হালনাগাদ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় NID থেকে মৌলিক
তথ্য যাচাই করা হয়। তাই BO Account খোলার আগে NID-এর নাম, জন্মতারিখসহ
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সঠিক আছে কিনা নিশ্চিত করা উচিত।
২. BO Account: শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য BO (Beneficiary Owner)
Account অন্যতম প্রধান প্রয়োজন। এই অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগকারীর কেনা সিকিউরিটিজ
ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। CDBL-এর তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারী যেকোনো CDBL
Participant-এর মাধ্যমে BO Account খুলতে পারেন। বর্তমানে CDBL অনলাইনেও BO
Account খোলার সুবিধা দিচ্ছে। তাই বিনিয়োগ শুরু করার আগে একটি সঠিকভাবে খোলা এবং
নিজের নামে পরিচালিত BO Account থাকা দরকার।
৩. ব্যাংক অ্যাকাউন্টঃ BO Account খোলার জন্য একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের
তথ্য প্রয়োজন হয়। CDBL-এর অনলাইন নির্দেশনায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেকবুক বা
ব্যাংক সার্টিফিকেটের কপি প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের
routing number এবং account number-এর মতো তথ্য যাচাই করা হয়। তাই BO Account
খোলার সময় নিজের নামে সঠিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তীতে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অর্থ ও ডিভিডেন্ড ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ব্যাংক
অ্যাকাউন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
৪. মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলঃ BO Account খোলার প্রক্রিয়ায় একটি সক্রিয়
মোবাইল নম্বর প্রয়োজন হয়। CDBL-এর অনলাইন সিস্টেমে OTP এবং BO-সংক্রান্ত SMS
পাওয়ার জন্য মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়। ই-মেইল ঠিকানাও অ্যাকাউন্ট ও
যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাজে লাগে; বিশেষ করে NRB বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি
প্রয়োজনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা সক্রিয়
মোবাইল নম্বর ও প্রয়োজনীয় ই-মেইল ব্যবহার করাই ভালো।
৫. ছবি ও স্বাক্ষরঃ অনলাইনে BO Account খোলার সময় সাম্প্রতিক ডিজিটাল ছবি
এবং স্বাক্ষরের স্ক্যান কপি প্রয়োজন হতে পারে। CDBL-এর নির্দেশনায় ছবি ও
স্বাক্ষর নির্দিষ্ট ডিজিটাল ফরম্যাটে প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে। অনলাইন
আবেদন করার আগে এসব ফাইল প্রস্তুত রাখলে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া সহজ হয়।
ছবির ক্ষেত্রে CDBL-এর নির্ধারিত ফাইলের আকার ও ফরম্যাটের নির্দেশনা অনুসরণ করা
উচিত, যাতে আবেদন জমা দেওয়ার সময় প্রযুক্তিগত সমস্যা না হয়।
৬. বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থঃ শেয়ার কেনার জন্য অবশ্যই
বিনিয়োগযোগ্য অর্থ থাকতে হবে। তবে কত টাকা দিয়ে শুরু করবেন, তার নির্দিষ্ট একক
পরিমাণ নেই। নিজের আয়, সঞ্চয়, আর্থিক লক্ষ্য এবং ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী
বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। শেয়ারের বাজারমূল্য পরিবর্তিত হওয়ায়
বিনিয়োগের মূল্য কমতেও পারে। তাই দৈনন্দিন খরচ বা জরুরি প্রয়োজনের অর্থের
পরিবর্তে আলাদা বিনিয়োগযোগ্য অর্থ ব্যবহার করা এবং একবারে অতিরিক্ত অর্থ ঝুঁকিতে
না ফেলা বিচক্ষণ পদ্ধতি।
৭. নিবন্ধিত ব্রোকার বা CDBL Participant: শেয়ার কেনাবেচার জন্য একজন
বিনিয়োগকারীকে উপযুক্ত নিবন্ধিত ব্রোকার বা CDBL Participant-এর সঙ্গে
অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। CDBL-এর তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারী যেকোনো CDBL
Participant-এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন এবং সেই Participant CDBL-এ
বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। ব্রোকার বাছাইয়ের সময় অনুমোদন, ট্রেডিং
সুবিধা, চার্জ, গ্রাহকসেবা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো যাচাই করা ভালো।
৮. শেয়ার বাজার সম্পর্কে জ্ঞানঃ শুধু BO Account ও টাকা থাকলেই ভালো
বিনিয়োগকারী হওয়া যায় না; শেয়ার বাজারের মৌলিক জ্ঞান থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, EPS, NAV, ডিভিডেন্ড, ঋণ, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং
শেয়ারের মূল্যায়ন সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। একই সঙ্গে বাজারের ঝুঁকি, Buy/Sell
Order এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা বোঝা দরকার। বিনিয়োগের আগে তথ্য যাচাই করা এবং
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বা “নিশ্চিত লাভের” দাবির ওপর নির্ভর না করাই
নিরাপদ।
শেয়ার কেনা ও বিক্রির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে শেয়ার কেনাবেচা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ধাপ অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশে শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে DSE ও CSE-এর স্বয়ংক্রিয় ট্রেডিং ব্যবস্থা
এবং BSEC-এর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শুধু শেয়ার
কেনা বা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলেই প্রক্রিয়া শেষ হয় না, সঠিক ব্রোকার নির্বাচন,
অর্ডার দেওয়া, ট্রেড নিশ্চিত করা, Contract Note সংরক্ষণ এবং settlement সম্পন্ন
হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
১. ব্রোকারের মাধ্যমে ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুলুনঃ শেয়ার কেনাবেচার শুরুতে
একজন বিনিয়োগকারীকে একটি অনুমোদিত স্টক ব্রোকারের সঙ্গে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়।
ব্রোকারই বিনিয়োগকারীর হয়ে স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার কেনা-বেচার অর্ডার কার্যকর
করে। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় পরিচয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হয়।
একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীর নিজের নামে BO Account থাকা জরুরি, যেখানে কেনা শেয়ার
ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। CDBL-এর মাধ্যমে BO Account খোলার সুবিধা রয়েছে।
২. শেয়ার কেনার জন্য অর্থ জমা করুনঃ অ্যাকাউন্ট প্রস্তুত হওয়ার পর
শেয়ার কেনার জন্য ব্রোকারের নির্ধারিত ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ রাখতে
হয়। কত টাকা বিনিয়োগ করবেন তা নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা
অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। শেয়ারের মূল্য ছাড়াও প্রযোজ্য ব্রোকারেজ ও
অন্যান্য লেনদেন-সংক্রান্ত খরচ বিবেচনা করতে হবে। BSEC-এর নির্দেশিকায়
বিনিয়োগকারীদের সময়মতো ক্রয়কৃত শেয়ারের মূল্য পরিশোধ এবং ব্রোকারেজ পরিশোধের
কথা বলা হয়েছে।
৩. কোম্পানি ও শেয়ার বিশ্লেষণ করুনঃ শেয়ার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি
সম্পর্কে ভালোভাবে গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির ব্যবসা, আয়, মুনাফা, EPS,
NAV, ঋণের পরিমাণ, ডিভিডেন্ড ইতিহাস, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের
পরিস্থিতি বিবেচনা করা যেতে পারে। শুধু শেয়ারের দাম কম বলে সেটিকে ভালো বিনিয়োগ
মনে করা উচিত নয়। BSEC-এর Investor Education Program-এ বিনিয়োগ বিশ্লেষণ,
আর্থিক পরিকল্পনা, ঝুঁকি-রিটার্ন এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ পরিকল্পনার
ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. Buy Order দিনঃ কোনো শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ব্রোকারের
ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম বা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে Buy Order দিতে হয়। অর্ডারে
সাধারণত শেয়ারের নাম, পরিমাণ এবং যে দামে কিনতে চান তা নির্ধারণ করা হয়।
BSEC-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, অর্ডার দেওয়ার পর বিনিয়োগকারীর Order
Confirmation Slip পাওয়া উচিত। অর্ডারটি বাজারে কার্যকর হওয়ার জন্য একজন
বিক্রেতার উপযুক্ত Sell Order-এর সঙ্গে মিল তৈরি হতে হবে।
৫. Buy ও Sell Order ম্যাচ হলে ট্রেড সম্পন্ন হয়ঃ স্টক এক্সচেঞ্জের
ট্রেডিং ব্যবস্থায় ক্রেতার Buy Order এবং বিক্রেতার Sell Order উপযুক্ত শর্তে
মিললে Trade বা লেনদেন সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ আপনি যে দামে এবং যে পরিমাণ শেয়ার
কিনতে চান, সেই অনুযায়ী বিক্রেতার অর্ডার পাওয়া গেলে আপনার ক্রয় সম্পন্ন হতে
পারে। একইভাবে একজন বিক্রেতার শেয়ার তখনই বিক্রি হয় যখন তার অর্ডারের সঙ্গে
উপযুক্ত ক্রয় অর্ডার মিলে যায়। DSE ও CSE-তে স্বয়ংক্রিয় ট্রেডিং ব্যবস্থা
ব্যবহৃত হয়।
৬. Trade Confirmation ও Contract Note যাচাই করুনঃ ট্রেড সম্পন্ন হওয়ার
পর লেনদেনের তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। BSEC-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী,
ট্রেড সম্পন্ন হওয়ার পর Trade Confirmation Slip এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে
Contract Note পাওয়া উচিত। Contract Note-এ শেয়ারের নাম, পরিমাণ, মূল্য, ট্রেড
নম্বর, অর্ডার নম্বর, ব্রোকারেজ ও অন্যান্য লেনদেনের তথ্য থাকতে পারে। এসব তথ্য
নিজের অর্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। কোনো ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে দ্রুত
ব্রোকারকে জানানো ভালো।
৭. কেনা শেয়ার BO Account-এ জমা হয়ঃ ক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত
Settlement প্রক্রিয়া শেষ হলে শেয়ার বিনিয়োগকারীর BO Account-এ জমা হয়।
CDBL-এর Central Depository System-এ সিকিউরিটিজ ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণ ও
ব্যবস্থাপনা করা হয়। বিনিয়োগকারীরা CDBL-এর Balance Inquiry ও SMS Alert-এর মতো
সেবা ব্যবহার করে তাদের BO Account-এর তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। তাই শেয়ার
কেনার পর নিজের BO Account-এ শেয়ারের সংখ্যা ও অবস্থান সঠিকভাবে প্রতিফলিত
হয়েছে কিনা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. শেয়ার বিক্রি করতে Sell Order দিনঃ আপনি যখন কোনো শেয়ার বিক্রি করতে
চান, তখন ব্রোকারের মাধ্যমে Sell Order দিতে হয়। সেখানে কতটি শেয়ার এবং কী দামে
বিক্রি করতে চান তা নির্ধারণ করা হয়। উপযুক্ত ক্রেতার Buy Order-এর সঙ্গে আপনার
Sell Order ম্যাচ হলে বিক্রয় সম্পন্ন হয়। BSEC-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিক্রি
করা শেয়ার settlement-এর জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্রোকারের কাছে সরবরাহ
করতে হয়। বর্তমানে ইলেকট্রনিক BO ব্যবস্থার কারণে এই প্রক্রিয়াটি মূলত
ডিপোজিটরি সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
৯. বিক্রির পর অর্থ পাওয়া যায়ঃ শেয়ার বিক্রির ট্রেড সম্পন্ন হওয়ার পর
clearing ও settlement প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী
বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিনিয়োগকারীর পাওনা হিসেবে নিষ্পত্তি করা হয়। BSEC-এর
বিনিয়োগ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীর বিক্রয়-সংক্রান্ত অর্থ সময়মতো
পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই বিক্রির পর Contract Note এবং Settlement-এর তথ্য
সংরক্ষণ করা উচিত। কোনো বিলম্ব বা অসঙ্গতি দেখা দিলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারের
সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ
রয়েছে।
নতুনদের জন্য শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কৌশল
শেয়ার বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত
লাভের চেষ্টা না করে পরিকল্পনা, বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব
দেওয়া। BSEC-এর Investor Education Program-এও বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, আর্থিক
পরিকল্পনা, ঝুঁকি-রিটার্ন, সিকিউরিটিজ বিশ্লেষণ এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার ওপর
গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। BSEC একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় যে পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ
এবং জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করা উচিত।
১. আগে শেয়ার বাজারের মৌলিক বিষয় শিখুনঃ নতুনদের প্রথম কৌশল হওয়া উচিত
শেয়ার বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা। শেয়ার, IPO, BO Account, DSE,
CSE, Buy Order, Sell Order, ডিভিডেন্ড, EPS, NAV, P/E Ratio এবং Capital Gain
এসব বিষয় আগে বুঝে নেওয়া ভালো। একই সঙ্গে বাজারের ঝুঁকি এবং বিনিয়োগকারীর
অধিকার সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার। BSEC-এর Investor Education Program-এ
বিনিয়োগ শিক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ঝুঁকি, সিকিউরিটিজ বিশ্লেষণ ও
পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়।
২. দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করুনঃ নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য
দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি রাখা তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শেয়ারের
দাম ওঠানামা দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার পরিবর্তে ভালো কোম্পানির ব্যবসায়িক
সম্ভাবনা ও আর্থিক সক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। বিনিয়োগের আগে স্বল্প,
মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ করা
ভালো। BSEC-এর বিনিয়োগ নির্দেশনাতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এবং বিনিয়োগের
সময়কাল অনুযায়ী মূলধন বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৩. মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানি খুঁজুনঃ শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির
মৌলিক আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা নতুনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কোম্পানির
আয়, মুনাফা, EPS, সম্পদ, ঋণ, নগদ প্রবাহ, ডিভিডেন্ড ইতিহাস, কর্পোরেট সুশাসন এবং
ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। শুধু কোনো শেয়ারের দাম কম বা
আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে এমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
BSEC-এর বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমেও সিকিউরিটিজ ও বিনিয়োগ বিশ্লেষণের ওপর
গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. সব টাকা একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন নাঃ নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য
Diversification বা পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
কৌশল। পুরো বিনিয়োগ একটি কোম্পানি বা একটি খাতে রাখলে সেই কোম্পানি বা খাতে
সমস্যা হলে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী
বিভিন্ন খাত বা বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
BSEC-এর বিনিয়োগ নির্দেশনাতেও বিভিন্ন সেক্টর ও ধরনের সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের
মাধ্যমে পোর্টফোলিও গঠন করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে।
৫. গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টিপস এড়িয়ে চলুনঃ শেয়ার বাজারে
নতুনদের একটি বড় ভুল হলো গুজব বা অন্যের “গ্যারান্টেড লাভের” পরামর্শ অনুসরণ করে
শেয়ার কেনা। কোনো ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব ভিডিও, মেসেঞ্জার গ্রুপ বা ব্যক্তিগত
পরিচিত কেউ কোনো শেয়ারের দাম বাড়বে বললেই সেটি সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিনিয়োগের আগে কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করা জরুরি।
BSEC-এর বিনিয়োগ নির্দেশনাতেও অতিরিক্ত লাভের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকতে বলা
হয়েছে।
৬. নিজের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা বুঝুনঃ প্রতিটি বিনিয়োগকারীর আর্থিক
অবস্থা ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা এক নয়। তাই শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার আগে আপনি
কত টাকা হারালেও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় সমস্যা হবে না, সেটি বিবেচনা করা
উচিত। জরুরি খরচের টাকা বা এমন অর্থ, যা নির্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই প্রয়োজন হবে,
শেয়ার বাজারে ঝুঁকিতে না ফেলাই ভালো। BSEC-এর Financial Literacy Program-ও
ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন বিনিয়োগের ঝুঁকি বোঝার ওপর গুরুত্ব
দেয়।
৭. ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করুনঃ নতুনদের জন্য একবারে পুরো বিনিয়োগযোগ্য অর্থ
বাজারে ঢেলে দেওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করা একটি
ব্যবহারিক কৌশল হতে পারে। এতে বাজারের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামার প্রভাব কিছুটা
সামলানো সহজ হতে পারে এবং বিনিয়োগকারী ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা
বাড়াতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিই লাভের নিশ্চয়তা দেয় না। বিনিয়োগের
পরিমাণ নির্ধারণের সময় নিজের বাজেট, আর্থিক লক্ষ্য এবং ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা
বিবেচনা করা উচিত।
৮. নিয়মিত পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করুনঃ শেয়ার কেনার পর বিনিয়োগ শেষ
হয়ে যায় না। কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, ব্যবসায়িক পরিবর্তন, ডিভিডেন্ড, ঋণ,
ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক খাতের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কোনো
কোম্পানির মৌলিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত
পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে প্রতিদিনের সামান্য মূল্য পরিবর্তনের কারণে
আতঙ্কিত হয়ে Buy/Sell সিদ্ধান্ত নেওয়া সবসময় যুক্তিযুক্ত নয়। BSEC-এর
Investor Education Program-এ Portfolio Management-কে বিনিয়োগ শিক্ষার
গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৯. লোভ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুনঃ শেয়ার বাজারে লোভ, ভয় ও আবেগ অনেক সময়
বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কোনো শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়লে
অতিরিক্ত লাভের আশায় না বুঝে কেনা এবং দাম কমলে আতঙ্কিত হয়ে বিক্রি করা নতুনদের
সাধারণ ভুল হতে পারে। তাই আগে থেকেই বিনিয়োগের লক্ষ্য, ঝুঁকির সীমা এবং কোন
পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন তা নির্ধারণ করা ভালো। BSEC-এর বিনিয়োগ
শিক্ষা কার্যক্রমের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ ঝুঁকি ও বাস্তবসম্মত আর্থিক
সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও রয়েছে।
১০. নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে থাকুনঃ শেয়ার বাজারে নিশ্চিত বা
গ্যারান্টিযুক্ত লাভ বলে কিছু ধরে নেওয়া উচিত নয়। বাজারের মূল্য পরিবর্তনশীল
হওয়ায় কোনো বিনিয়োগেই নির্দিষ্ট মুনাফা নিশ্চিত করা যায় না। কেউ যদি অল্প
সময়ে অস্বাভাবিক বা নিশ্চিত রিটার্নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা বিনিয়োগ করতে
বলে, তাহলে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার। BSEC-এর বর্তমান Investor Education
তথ্যেও পুঁজিবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে জেনে ও বুঝে বিনিয়োগ করার
পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সুবিধা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে
বাজারের দামের ওঠানামা, কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও তারল্য
সমস্যার কারণে বিনিয়োগে ক্ষতির সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই বিনিয়োগের আগে সম্ভাব্য
লাভের পাশাপাশি ঝুঁকিগুলোও মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিনিয়োগকারী যদি
কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার সম্ভাবনা, মূল্যায়ন এবং নিজের ঝুঁকি গ্রহণের
ক্ষমতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আরও সচেতনভাবে বিনিয়োগ পরিচালনা করতে
পারেন।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সুবিধা
১. মূলধনী লাভের সুযোগঃ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান সুবিধা
হলো মূলধনী লাভের (Capital Gain) সম্ভাবনা। কোনো কোম্পানির শেয়ার তুলনামূলক কম
দামে কেনার পর ভবিষ্যতে তার বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেলে বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করা
যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ৫০ টাকা দরে কেনা শেয়ারের দাম ৭০ টাকা হলে প্রতি
শেয়ারে ২০ টাকা লাভের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই লাভ নিশ্চিত নয়। বাজার পরিস্থিতি,
কোম্পানির পারফরম্যান্স এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার কারণে শেয়ারের দাম কমেও
যেতে পারে।
২. ডিভিডেন্ড পাওয়ার সম্ভাবনাঃ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের আরেকটি সুবিধা
হলো ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ পাওয়ার সম্ভাবনা। কোনো কোম্পানি ব্যবসা করে মুনাফা
অর্জন করলে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী
শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে পারে। ডিভিডেন্ড নগদ বা অন্যান্য অনুমোদিত
উপায়ে হতে পারে। তবে প্রত্যেক কোম্পানি নিয়মিত বা একই পরিমাণ ডিভিডেন্ড দেয়
না। তাই বিনিয়োগের আগে কোম্পানির মুনাফা, ডিভিডেন্ডের ইতিহাস, ব্যবসার
স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বেশি ডিভিডেন্ডের
আশায় বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৩. দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ তৈরির সুযোগঃ শেয়ার বাজারে ভালো কোম্পানিতে
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করলে সম্পদ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একটি কোম্পানি যদি
সময়ের সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিক্রয় বৃদ্ধি, মুনাফা অর্জন এবং বাজারে
অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির
সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি পাওয়া ডিভিডেন্ড পুনরায় বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের
পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই
কোম্পানির মৌলিক অবস্থা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
বিবেচনা করা জরুরি।
৪. ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে অংশগ্রহণঃ কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার
কিনলে বিনিয়োগকারী সেই কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ অর্জন করেন। ফলে কোম্পানির
ব্যবসা সফলভাবে বৃদ্ধি পেলে শেয়ারহোল্ডারও সেই প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য আর্থিক সুফল
পাওয়ার সুযোগ পান। যেমন, কোনো কোম্পানি নতুন পণ্য বাজারে আনে, বিক্রি বাড়ায়,
নতুন বাজারে প্রবেশ করে বা মুনাফা বৃদ্ধি করে—এসব ইতিবাচক পরিবর্তন ভবিষ্যতে
শেয়ারের মূল্য ও ডিভিডেন্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। এভাবে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা না
করেও একজন বিনিয়োগকারী একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে অংশ
নেওয়ার সুযোগ পান।
৫. পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য করার সুযোগঃ শেয়ার বাজারে বিভিন্ন কোম্পানি ও
খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ করে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ (Diversification) করা যায়।
যেমন, একজন বিনিয়োগকারী ব্যাংকিং, ওষুধ, খাদ্য, টেলিযোগাযোগ বা অন্যান্য খাতের
বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে পারেন। এতে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানি বা
খাতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমতে পারে। তবে বৈচিত্র্যকরণ ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর করে
না। বাজারজুড়ে বড় ধরনের পতন হলে একাধিক শেয়ারের মূল্য কমতে পারে। তাই
বৈচিত্র্য করার পাশাপাশি কোম্পানির গুণগত ও আর্থিক অবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সম্ভাব্য ঝুঁকি
১. শেয়ারের দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকিঃ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের অন্যতম
প্রধান ঝুঁকি হলো শেয়ারের বাজারমূল্য কমে যাওয়া। কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক
ফলাফল খারাপ হওয়া, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, বাজারে বিক্রির চাপ বৃদ্ধি বা
বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে শেয়ারের দাম কমতে পারে। আপনি যে দামে
শেয়ার কিনেছেন, তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করলে মূলধনী ক্ষতি হতে পারে। তাই
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সময় লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি মূলধন কমে যাওয়ার
সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত। BSEC-ও পুঁজিবাজারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকার
পরামর্শ দেয়।
২. কোম্পানিভিত্তিক ঝুঁকিঃ যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই
কোম্পানির নিজস্ব সমস্যার কারণেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্যবসায় মুনাফা
কমে যাওয়া, বিক্রয় হ্রাস, অতিরিক্ত ঋণ, পরিচালনাগত দুর্বলতা, কর্পোরেট সুশাসনের
সমস্যা বা প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া কোম্পানির আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে
পারে। এসব কারণে শেয়ারের বাজারমূল্য কমে যেতে পারে এবং ডিভিডেন্ডের পরিমাণও কমতে
বা বন্ধ হতে পারে। তাই শুধু শেয়ারের বর্তমান দাম নয়, কোম্পানির আর্থিক
প্রতিবেদন, ব্যবসার মডেল, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকিঃ শেয়ার বাজারে মূল্যের অস্থিরতা বা
Volatility একটি স্বাভাবিক বিষয়। অর্থনৈতিক সংকট, সুদের হার পরিবর্তন, রাজনৈতিক
বা বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বড় কোনো সংবাদ এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের পরিবর্তনের
কারণে অল্প সময়ের মধ্যে শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করতে পারে। ফলে
ভালো কোম্পানির শেয়ারও সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। নতুন বিনিয়োগকারীরা এমন
পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করলে ক্ষতি হতে পারে। তাই বাজারের
স্বাভাবিক ওঠানামা বুঝে বিনিয়োগের সময়কাল ও ঝুঁকি সহনশীলতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত
নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৪. তারল্য ঝুঁকিঃ তারল্য ঝুঁকি (Liquidity Risk) বলতে বোঝায়, কোনো শেয়ার
দ্রুত বিক্রি করতে চাইলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা না পাওয়া বা প্রত্যাশিত দামে বিক্রি
করতে না পারার সম্ভাবনা। বিশেষ করে কম লেনদেন হওয়া শেয়ারের ক্ষেত্রে এই সমস্যা
তুলনামূলক বেশি দেখা দিতে পারে। আপনি কোনো শেয়ার কিনে রাখার পর জরুরি ভিত্তিতে
বিক্রি করতে চাইলে বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকলে কম দামে বিক্রি করতে হতে
পারে। তাই বিনিয়োগের আগে শেয়ারের লেনদেনের পরিমাণ ও বাজারে তার তারল্য সম্পর্কে
ধারণা নেওয়া ভালো।
৫. ডিভিডেন্ড না পাওয়ার ঝুঁকিঃ কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনলেই নিয়মিত
ডিভিডেন্ড পাওয়া নিশ্চিত নয়। কোম্পানি পর্যাপ্ত মুনাফা না করলে, ব্যবসা
সম্প্রসারণের জন্য অর্থ ধরে রাখলে অথবা পরিচালনা পর্ষদ ডিভিডেন্ড ঘোষণা না করলে
শেয়ারহোল্ডার প্রত্যাশিত লভ্যাংশ নাও পেতে পারেন। এমনকি অতীতে ভালো ডিভিডেন্ড
দেওয়া কোনো কোম্পানিও ভবিষ্যতে কম ডিভিডেন্ড দিতে পারে। তাই শুধু অতীতের
ডিভিডেন্ড দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কোম্পানির বর্তমান মুনাফা,
নগদ প্রবাহ, ব্যবসার অবস্থা এবং ডিভিডেন্ড নীতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
শেয়ার বাজারের ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক পরিকল্পনার
মাধ্যমে তা ব্যবস্থাপনা করা যায়। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণ, বিভিন্ন
খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়া, নিজের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী অর্থ
বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুজব,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনির্ভরযোগ্য টিপস বা নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি এড়ানো
উচিত। BSEC-এর Investor Education Program-এও বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, ঝুঁকি-রিটার্ন,
আর্থিক পরিকল্পনা ও পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভালো কোম্পানির শেয়ার নির্বাচন করার উপায়
ভালো কোম্পানির শেয়ার নির্বাচন করতে শুধু শেয়ারের বর্তমান দাম বা অন্যের
পরামর্শের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বরং কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, মুনাফার
ধারাবাহিকতা, EPS, NAV, ঋণের পরিমাণ, নগদ প্রবাহ, ডিভিডেন্ড ইতিহাস, মূল্যায়ন
এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা উচিত। BSEC-এর Financial
Literacy উদ্যোগেও EPS, P/E Ratio, Dividend Yield, NAV, ROE এবং Debt-Equity
Ratio-এর মতো সূচক বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১. কোম্পানির ব্যবসা ও খাত বুঝুনঃ প্রথমে যে কোম্পানির শেয়ার কিনতে চান,
সেই কোম্পানি কীভাবে আয় করে, কী পণ্য বা সেবা দেয় এবং ভবিষ্যতে তার চাহিদা কেমন
হতে পারে তা বুঝুন। একই সঙ্গে কোম্পানিটি যে খাতে কাজ করে সেই খাতের প্রতিযোগিতা,
বাজারের আকার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত। একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক
মডেল দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির আয় ও মুনাফা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। শুধু
শেয়ারের দাম কম হওয়াকে ভালো কোম্পানির পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
২. EPS ও মুনাফার ধারাবাহিকতা দেখুনঃ EPS (Earnings Per Share) কোম্পানি
প্রতি শেয়ারে কত আয় করছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ভালো কোম্পানি বাছাইয়ের
সময় শুধু সর্বশেষ EPS নয়, কয়েক বছরের EPS ও মুনাফার প্রবণতা দেখা ভালো।
ধারাবাহিকভাবে মুনাফা ও EPS বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না, কোনো বছরে বড় পতন হয়েছে কি না
এবং সেই পরিবর্তনের কারণ কী এসব বিশ্লেষণ করুন। BSEC-এর আর্থিক তথ্য কাঠামোতেও
তালিকাভুক্ত কোম্পানির EPS প্রকাশের বিষয়টি রয়েছে।
৩. P/E Ratio বিবেচনা করুনঃ P/E (Price-to-Earnings) Ratio শেয়ারের
বাজারমূল্য কোম্পানির আয়ের তুলনায় কতটা বেশি বা কম তা বোঝার একটি প্রচলিত সূচক।
তবে শুধু কম P/E দেখেই কোনো শেয়ারকে সস্তা বা ভালো মনে করা উচিত নয়। একই খাতের
অন্যান্য কোম্পানির P/E এবং কোম্পানিটির নিজের ঐতিহাসিক P/E-এর সঙ্গে তুলনা করা
বেশি কার্যকর। কম P/E-এর পেছনে দুর্বল ব্যবসা, কমে যাওয়া মুনাফা বা অন্য কোনো
সমস্যা থাকতে পারে। তাই P/E-কে অন্যান্য আর্থিক সূচকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।
৪. ঋণ ও Debt-Equity Ratio দেখুনঃ কোম্পানির ঋণের পরিমাণ তার আর্থিক ঝুঁকি
বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। Debt-to-Equity Ratio ব্যবহার করে কোম্পানি তার
নিজস্ব মূলধনের তুলনায় কতটা ঋণের ওপর নির্ভর করছে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া
যায়। অতিরিক্ত ঋণের কারণে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে
ব্যবসায় আয় কমে গেলে। তাই ভালো কোম্পানি নির্বাচনের সময় ঋণের পরিমাণ, সুদের
খরচ এবং সময়ের সঙ্গে ঋণ বাড়ছে নাকি কমছে তা পরীক্ষা করা উচিত। BSEC-এর
Financial Literacy উদ্যোগেও Debt-Equity Ratio বিশ্লেষণের সুবিধা রয়েছে।
৫. NAV ও সম্পদের অবস্থা যাচাই করুনঃ NAV (Net Asset Value) per Share
কোম্পানির নিট সম্পদের প্রতি শেয়ারে আনুমানিক হিসাব বোঝাতে সাহায্য করে।
কোম্পানির সম্পদ, দায় এবং NAV-এর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করলে আর্থিক অবস্থার একটি
ধারণা পাওয়া যায়। তবে NAV-কে শেয়ারের বাজারমূল্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করেই
সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, কোম্পানির ব্যবসার ধরন অনুযায়ী NAV-এর গুরুত্ব আলাদা
হতে পারে। তাই NAV-এর পাশাপাশি EPS, মুনাফা, ঋণ এবং নগদ প্রবাহও বিবেচনা করা
দরকার। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে NAV per share প্রকাশের বিধান
রয়েছে।
৬. ডিভিডেন্ডের ইতিহাস দেখুনঃ নিয়মিত ও টেকসই ডিভিডেন্ড দেওয়ার ইতিহাস
একটি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তবে শুধু বেশি Dividend
Yield দেখেই শেয়ার নির্বাচন করা ঠিক নয়। কোম্পানি কেন বেশি ডিভিডেন্ড দিচ্ছে,
তার মুনাফা ও নগদ প্রবাহ যথেষ্ট কি না এবং ডিভিডেন্ড দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব
কি না এসব প্রশ্নও দেখতে হবে। BSEC-এর Financial Literacy প্ল্যাটফর্মে Dividend
Yield হিসাব ও বিশ্লেষণের সুবিধা রয়েছে।
৭. Operating Cash Flow যাচাই করুনঃ কাগজে মুনাফা দেখালেই কোম্পানির
আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী এমনটা সবসময় নয়। তাই Net Operating Cash Flow বা
ব্যবসার মূল কার্যক্রম থেকে আসা নগদ অর্থের প্রবাহও দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানি
নিয়মিত ব্যবসা থেকে নগদ অর্থ তৈরি করতে পারছে কি না এবং সেই নগদ প্রবাহ মুনাফার
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা পরীক্ষা করুন। BSEC-এর আর্থিক রিপোর্টিং কাঠামোতে
NOCFPS (Net Operating Cash Flow Per Share)-ও প্রকাশ করা হয়, যা কোম্পানির নগদ
প্রবাহ বিশ্লেষণে সহায়ক।
৮. কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পড়ুনঃ ভালো শেয়ার নির্বাচন করার সবচেয়ে
কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো কোম্পানির Annual Report ও প্রকাশিত Financial
Statements পরীক্ষা করা। আয়, মুনাফা, সম্পদ, দায়, নগদ প্রবাহ, EPS, NAV এবং
ডিভিডেন্ড এসব তথ্য থেকেই কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়।
DSE ও CSE তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক বিবরণী জমা দেওয়ার তথ্য প্রকাশের
ব্যবস্থাও চালু করেছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির রিপোর্টিং পরিস্থিতি দেখতে
পারেন।
৯. ব্যবস্থাপনা ও কর্পোরেট সুশাসন দেখুনঃ একটি কোম্পানির আর্থিক সংখ্যা
ভালো হলেও ব্যবস্থাপনা ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বল হলে বিনিয়োগের ঝুঁকি
বাড়তে পারে। পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের নিয়মিততা,
অডিট রিপোর্ট, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট ঘোষণাগুলো
যাচাই করা উচিত। DSE তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা মেনে
চলা পর্যবেক্ষণ করে এবং BSEC-এর অনুমোদিত নিয়মের অধীনে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো
পরিচালিত হয়।
১০. শেয়ারের বর্তমান মূল্যায়ন দেখুনঃ ভালো কোম্পানি হলেই তার শেয়ার
যেকোনো দামে ভালো বিনিয়োগ হবে এমন নয়। কোম্পানির ব্যবসা শক্তিশালী হলেও
শেয়ারের দাম যদি অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ রিটার্নের সম্ভাবনা কমে
যেতে পারে। তাই P/E, Dividend Yield, EPS growth এবং অন্যান্য মূল্যায়ন সূচকের
মাধ্যমে শেয়ারটি তুলনামূলকভাবে যুক্তিসঙ্গত দামে রয়েছে কি না দেখুন। একই খাতের
অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করাও সহায়ক।
১১. গুজবের পরিবর্তে প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করুনঃ ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব,
মেসেঞ্জার বা পরিচিত কারও এই শেয়ার নিশ্চিত বাড়বে ধরনের পরামর্শের ভিত্তিতে
বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। শেয়ার নির্বাচনের সময় কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক
প্রতিবেদন, DSE/CSE-এর তথ্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রকাশিত তথ্যকে অগ্রাধিকার
দেওয়া উচিত। DSE ও CSE তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক বিবরণী জমা দেওয়ার তথ্য
প্রকাশের ব্যবস্থা করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা
করতে সাহায্য করে।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগে সাধারণ ভুল এবং সেগুলো এড়ানোর উপায়
শেয়ার বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় পর্যাপ্ত তথ্য ও পরিকল্পনা ছাড়াই
বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। গুজবের
ওপর নির্ভর করা, কোম্পানি বিশ্লেষণ না করা, অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া, আবেগের বশে
কেনাবেচা এবং সব অর্থ একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করা এসব সাধারণ ভুল। বাংলাদেশ
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বিশ্লেষণ,
আর্থিক পরিকল্পনা, ঝুঁকি-রিটার্ন এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন
হওয়ার পরামর্শ দেয়।
১. গুজব বা অন্যের পরামর্শে শেয়ার কেনাঃ শেয়ার বাজারে নতুনদের অন্যতম
সাধারণ ভুল হলো ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব, মেসেঞ্জার বা পরিচিত ব্যক্তির পরামর্শ শুনে
শেয়ার কেনা। কেউ একটি শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়বে বললেই সেটি সত্য ধরে নেওয়া
উচিত নয়। এমন সিদ্ধান্তে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি উপেক্ষিত হতে
পারে। এ ভুল এড়াতে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, প্রকাশিত তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য
বাজার-তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। BSEC-ও বিনিয়োগকারীদের জ্ঞান ও
সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়।
২. কোম্পানি বিশ্লেষণ না করে বিনিয়োগ করাঃ শুধু শেয়ারের দাম কম বা কোনো
কোম্পানি জনপ্রিয় এ কারণে বিনিয়োগ করা একটি বড় ভুল। কোম্পানির EPS, মুনাফা,
ঋণ, NAV, নগদ প্রবাহ, ডিভিডেন্ড ইতিহাস এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই না
করলে প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা কঠিন। এই ভুল এড়াতে শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির আর্থিক
প্রতিবেদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা উচিত। BSEC-এর Investor
Education Program-এও securities analysis এবং investment planning-এর ওপর
গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩. সব টাকা একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করাঃ একটি কোম্পানির ওপর সম্পূর্ণ
বিনিয়োগ নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। কোম্পানিটির ব্যবসায়িক সমস্যা দেখা দিলে বা
শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে পুরো পোর্টফোলিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই
ভুল এড়াতে বিনিয়োগের অর্থ বিভিন্ন কোম্পানি বা খাতে Diversification করার কথা
বিবেচনা করা যায়। তবে অতিরিক্ত সংখ্যক শেয়ারে বিনিয়োগ করাও সবসময় কার্যকর
নয়; প্রতিটি বিনিয়োগের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। BSEC-এর বিনিয়োগ
শিক্ষা কার্যক্রমে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৪. দ্রুত বেশি লাভের চেষ্টা করাঃ অনেক নতুন বিনিয়োগকারী অল্প সময়ে অনেক
টাকা লাভ করার আশায় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেন। কোনো শেয়ার দ্রুত বাড়ছে দেখে দেরি না
করে কিনে ফেলা বা প্রতিদিন বারবার ট্রেড করা এ ধরনের ভুলের উদাহরণ। এতে বাজারের
স্বাভাবিক ওঠানামা ও লেনদেনের খরচের প্রভাব বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে নিজের
আর্থিক লক্ষ্য, বিনিয়োগের সময়সীমা ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা
করা ভালো। BSEC পুঁজিবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে জেনে-বুঝে বিনিয়োগের
পরামর্শ দেয়।
৫. শেয়ারের দাম কমলেই আতঙ্কিত হয়ে বিক্রি করাঃ কোনো শেয়ারের দাম কমে
গেলে অনেক বিনিয়োগকারী ভয় পেয়ে দ্রুত বিক্রি করে দেন। কিন্তু শুধুমাত্র
স্বল্পমেয়াদি মূল্যপতন দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সবসময় যুক্তিযুক্ত নয়।
কোম্পানির মৌলিক অবস্থা অপরিবর্তিত আছে কি না, নাকি ব্যবসায়িক বা আর্থিক সমস্যার
কারণে দাম কমেছে তা আগে বিশ্লেষণ করা দরকার। এই ভুল এড়াতে বিনিয়োগের আগে একটি
পরিষ্কার পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং বাজারের প্রতিটি সাময়িক ওঠানামায় আবেগপ্রবণ
সিদ্ধান্ত না নেওয়ার চেষ্টা করুন।
৬. বেশি দামে শেয়ার কিনে ফেলাঃ ভালো কোম্পানির শেয়ার হলেও অতিরিক্ত দামে
কেনা বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন কমিয়ে দিতে পারে। কোনো শেয়ারের দাম দ্রুত
বাড়ছে দেখে আরও বাড়বে, ধারণায় তাড়াহুড়ো করে কেনা নতুনদের একটি সাধারণ ভুল।
কেনার আগে কোম্পানির EPS, P/E Ratio, মুনাফার প্রবৃদ্ধি এবং একই খাতের অন্যান্য
কোম্পানির মূল্যায়নের সঙ্গে তুলনা করা ভালো। এতে শেয়ারটির বর্তমান মূল্য
তুলনামূলকভাবে যুক্তিসঙ্গত কি না সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
৭. বিনিয়োগের টাকা ও জরুরি সঞ্চয় এক করে ফেলাঃ শেয়ার বাজারে এমন অর্থ
বিনিয়োগ করা উচিত নয়, যা অল্প সময়ের মধ্যে দৈনন্দিন খরচ বা জরুরি প্রয়োজনে
দরকার হতে পারে। কারণ বাজারের দাম কমে গেলে সেই সময় শেয়ার বিক্রি করলে ক্ষতির
সম্ভাবনা থাকে। এ ভুল এড়াতে প্রথমে নিজের জরুরি সঞ্চয় ও নিয়মিত খরচের অর্থ
আলাদা রাখা এবং এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করা ভালো।
BSEC-এর Financial Literacy Program-ও সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন আর্থিক
পণ্যের ঝুঁকি বোঝার ওপর গুরুত্ব দেয়।
৮. ব্রোকারের নথি ও লেনদেন যাচাই না করাঃ শেয়ার কেনাবেচার পর অনেক
বিনিয়োগকারী Order Confirmation, Trade Confirmation এবং Contract Note ভালোভাবে
পরীক্ষা করেন না। অথচ এগুলো লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। BSEC-এর বিনিয়োগ
নির্দেশিকায় অর্ডার দেওয়ার পর Order Confirmation Slip, ট্রেড সম্পন্ন হলে
Trade Confirmation Slip এবং Contract Note পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই
প্রতিটি লেনদেনের তথ্য, শেয়ারের সংখ্যা, দাম, ব্রোকারেজ ও অন্যান্য বিবরণ যাচাই
করে সংরক্ষণ করা উচিত।
৯. কোম্পানির খারাপ খবর বা আর্থিক পরিবর্তন উপেক্ষা করাঃ শেয়ার কেনার পর
কোম্পানির কার্যক্রম আর পর্যবেক্ষণ না করা আরেকটি ভুল। কোম্পানির মুনাফা কমে
যাওয়া, ঋণ বেড়ে যাওয়া, ডিভিডেন্ড পরিবর্তন, ব্যবসায়িক সমস্যা বা গুরুত্বপূর্ণ
কর্পোরেট ঘোষণা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই নিয়মিত
কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও আর্থিক ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা উচিত। বিনিয়োগের মূল
কারণগুলো পরিবর্তিত হলে পোর্টফোলিও পুনর্মূল্যায়ন করাও দরকার। এতে শুধু শেয়ারের
দামের ওপর নির্ভর না করে ব্যবসার প্রকৃত অবস্থার দিকে নজর রাখা যায়।
১০. নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করাঃ ১০০% নিশ্চিত লাভ, ঝুঁকি
নেই বা নিশ্চিতভাবে দাম বাড়বে এ ধরনের দাবি বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে
বিবেচনা করা উচিত। শেয়ার বাজারে কোনো বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ রিটার্ন নিশ্চিত নয়
এবং বাজারের মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে। BSEC-এর বর্তমান Investor Education
তথ্যেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ। জেনে ও বুঝে বিনিয়োগ
করুন।” তাই নিশ্চিত লাভের প্রলোভনের পরিবর্তে যাচাইযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ এবং
নিজের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
শেয়ার বাজারে লাভ-লোকসান কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
শেয়ার বাজারে লাভ-লোকসান বিশ্লেষণ করতে শুধু শেয়ারের কেনা ও বিক্রির দামের
পার্থক্য দেখলেই হবে না। ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, শেয়ারের সংখ্যা, ব্রোকারেজ ও
অন্যান্য প্রযোজ্য লেনদেন খরচ এবং পাওয়া ডিভিডেন্ড সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।
BSEC বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, ঝুঁকি-রিটার্ন, আর্থিক পরিকল্পনা
এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে কমিশন সতর্ক করে যে
পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ এবং জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করা উচিত।
১. প্রথমে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হিসাব করুনঃ আপনি কত টাকা দিয়ে শেয়ার
কিনেছেন, সেটিই লাভ-লোকসান বিশ্লেষণের প্রথম ভিত্তি। মোট ক্রয়মূল্য = শেয়ারের
সংখ্যা × প্রতি শেয়ারের ক্রয়মূল্য। যেমন, ১০০টি শেয়ার ৫০ টাকা দরে কিনলে মূল
বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৫,০০০ টাকা। তবে প্রকৃত বিনিয়োগ ব্যয় নির্ধারণের সময়
প্রযোজ্য ব্রোকারেজ ও অন্যান্য লেনদেন খরচও বিবেচনা করা উচিত। কারণ শুধু শেয়ারের
ক্রয়মূল্য ধরে হিসাব করলে প্রকৃত লাভ বা ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
২. বর্তমান বাজারমূল্য হিসাব করুনঃ শেয়ার কেনার পর সেটির বর্তমান
বাজারমূল্য বের করলে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার বিনিয়োগ বর্তমানে কত টাকার। এর
জন্য বর্তমান বাজারমূল্য = বর্তমানে প্রতি শেয়ারের দাম × আপনার কাছে থাকা
শেয়ারের সংখ্যা সূত্র ব্যবহার করা যায়। ধরুন, ১০০টি শেয়ার ৫০ টাকা দরে কিনেছেন
এবং বর্তমানে দাম ৬০ টাকা। তাহলে বর্তমান বাজারমূল্য ৬,০০০ টাকা। অর্থাৎ
ক্রয়মূল্যের তুলনায় ১,০০০ টাকা বেশি। তবে শেয়ারটি এখনো বিক্রি না করলে এই
লাভকে সাধারণত Unrealized Gain বলা হয়।
৩. মূলধনী লাভ বা ক্ষতি বের করুনঃ শেয়ার বিক্রি করার পর প্রকৃত মূলধনী
লাভ বা ক্ষতি হিসাব করা সহজ। মূলধনী লাভ/ক্ষতি = বিক্রয়মূল্য − ক্রয়মূল্য।
উদাহরণ হিসেবে, ১০০টি শেয়ার ৫০ টাকা দরে কিনে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করলে
ক্রয়মূল্য ৫,০০০ টাকা এবং বিক্রয়মূল্য ৬,০০০ টাকা। ফলে খরচ বাদ দেওয়ার আগে
মূলধনী লাভ ১,০০০ টাকা। বিপরীতে ৪০ টাকা দরে বিক্রি করলে বিক্রয়মূল্য ৪,০০০ টাকা
এবং খরচ বাদ দেওয়ার আগে মূলধনী ক্ষতি হবে ১,০০০ টাকা।
৪. শতাংশ হিসেবে লাভ-লোকসান হিসাব করুনঃ শুধু টাকার অঙ্কে লাভ-লোকসান
জানলে বিভিন্ন বিনিয়োগের পারফরম্যান্স তুলনা করা কঠিন হতে পারে। তাই লাভের হার
(%) = (লাভ ÷ মোট ক্রয়মূল্য) × ১০০ সূত্র ব্যবহার করা যায়। যেমন, ৫,০০০ টাকা
বিনিয়োগ করে ১,০০০ টাকা লাভ হলে লাভের হার ২০%। একইভাবে ১,০০০ টাকা ক্ষতি হলে
ক্ষতির হার ২০%। তবে বাস্তব রিটার্ন হিসাবের সময় ব্রোকারেজ, অন্যান্য খরচ এবং
প্রাপ্ত ডিভিডেন্ডও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
৫. ডিভিডেন্ডকে মোট রিটার্নের অংশ হিসেবে ধরুনঃ শেয়ার থেকে শুধু দাম
বাড়ার মাধ্যমে নয়, ডিভিডেন্ডের মাধ্যমেও রিটার্ন আসতে পারে। তাই কোনো
বিনিয়োগের মোট লাভ বিশ্লেষণ করার সময় প্রাপ্ত নগদ ডিভিডেন্ড বা প্রযোজ্য
অন্যান্য সুবিধাকেও হিসাবের মধ্যে রাখা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, ৫,০০০ টাকা বিনিয়োগে
শেয়ারের মূল্য বেড়ে ৬,০০০ টাকা হয়েছে এবং একই সময়ে ২০০ টাকা ডিভিডেন্ড
পেয়েছেন। তাহলে খরচ বাদ দেওয়ার আগে মোট আর্থিক সুবিধা ১,২০০ টাকা। ফলে প্রকৃত
রিটার্ন শুধু শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে না।
৬. লেনদেনের খরচ বাদ দিয়ে প্রকৃত লাভ দেখুনঃ শেয়ারের ক্রয়-বিক্রয়ের
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ব্রোকারেজ ও অন্যান্য লেনদেন-সংক্রান্ত খরচ থাকায় কাগজে দেখা
লাভ এবং প্রকৃত লাভ এক নয়। ধরুন, শেয়ার বিক্রি করে ১,০০০ টাকা লাভ হয়েছে,
কিন্তু সংশ্লিষ্ট লেনদেনের মোট খরচ ১০০ টাকা। তাহলে অন্যান্য সমন্বয় বাদ দেওয়ার
আগে নিট লাভ হবে ৯০০ টাকা। তাই বিনিয়োগের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের সময় প্রতিটি
ট্রেডের Contract Note ও সংশ্লিষ্ট খরচ সংরক্ষণ করা ভালো। BSEC বিনিয়োগকারীদের
লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য ও নথি সম্পর্কে সচেতন থাকার ওপর গুরুত্ব দেয়।
৭. Unrealized ও Realized লাভ আলাদা করুনঃ শেয়ারের দাম বেড়েছে কিন্তু
আপনি এখনো বিক্রি করেননি এক্ষেত্রে সেটিকে Unrealized Gain হিসেবে দেখা যায়।
অন্যদিকে শেয়ার বিক্রি করে লাভ বা ক্ষতি চূড়ান্ত হলে সেটি Realized Gain/Loss।
এই পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজারমূল্য প্রতিদিন পরিবর্তিত হতে পারে। আজ
২০% কাগুজে লাভ থাকা কোনো শেয়ার আগামীকাল ১০% কমে যেতে পারে। তাই পোর্টফোলিও
মূল্যায়নের সময় বর্তমান বাজারমূল্য এবং বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া বিক্রয় দুই
ধরনের ফলাফল আলাদাভাবে হিসাব করা উচিত।
৮. পোর্টফোলিওর মোট লাভ-লোকসান দেখুনঃ একটি শেয়ার লাভ করেছে বলেই পুরো
বিনিয়োগ ভালো করেছে এমন নয়। আপনার কাছে থাকা সব শেয়ারের বর্তমান মূল্য,
ক্রয়মূল্য, ডিভিডেন্ড এবং খরচ একসঙ্গে বিবেচনা করে মোট পোর্টফোলিও রিটার্ন হিসাব
করা উচিত। যেমন একটি শেয়ারে ২,০০০ টাকা লাভ হলেও অন্য দুটি শেয়ারে মোট ৩,০০০
টাকা ক্ষতি হলে পুরো পোর্টফোলিওতে ১,০০০ টাকা ক্ষতি থাকতে পারে। BSEC-এর Investor
Education Program-এও Portfolio Management-কে বিনিয়োগ বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ
অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
৯. কোম্পানির আর্থিক ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুনঃ লাভ-লোকসান শুধু
শেয়ারের দাম দিয়ে বিশ্লেষণ করলে ছবিটি অসম্পূর্ণ থাকে। কোম্পানির মুনাফা, EPS,
নগদ প্রবাহ, ঋণ, ডিভিডেন্ড এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ কেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, তাও দেখা
উচিত। শেয়ারের দাম বাড়লেও যদি কোম্পানির মৌলিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকে, তাহলে
ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার সাময়িক বাজার পতনে ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেও
কোম্পানির ব্যবসা শক্তিশালী থাকতে পারে। তাই মূল্য পরিবর্তনের পাশাপাশি কোম্পানির
আর্থিক ও ব্যবসায়িক তথ্য বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ঝুঁকি-রিটার্ন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করুনঃ শুধু কত শতাংশ লাভ হয়েছে তা
দেখলেই বিনিয়োগের সাফল্য নির্ধারণ করা যায় না। কতটা ঝুঁকি নিয়ে সেই রিটার্ন
অর্জিত হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শেয়ার ৩০% লাভ দিয়েছে, কিন্তু একই
সময়ে অত্যন্ত বেশি মূল্য ওঠানামা করেছে অন্যদিকে আরেকটি শেয়ার ২০% লাভ দিয়েছে
তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে। তাই বিনিয়োগ বিশ্লেষণে রিটার্নের পাশাপাশি মূল্য
অস্থিরতা, কোম্পানির ঝুঁকি এবং পোর্টফোলিওর বৈচিত্র্য বিবেচনা করা উচিত। BSEC-এর
Investor Education Program-এ ঝুঁকি ও রিটার্ন দুটিই গুরুত্ব পায়।
সহজ উদাহরণঃ
- ধরুন আপনি ১০০টি শেয়ার ৫০ টাকা করে কিনলেন।
- মোট ক্রয়মূল্য = ১০০ × ৫০ = ৫,০০০ টাকা
- পরে দাম হলো ৬০ টাকা
- বর্তমান বাজারমূল্য = ১০০ × ৬০ = ৬,০০০ টাকা
- কাগুজে লাভ = ১,০০০ টাকা
- লাভের হার = ২০%
এর মধ্যে যদি ২০০ টাকা ডিভিডেন্ড পান এবং প্রযোজ্য লেনদেন খরচ ১০০ টাকা হয়,
তাহলে সামগ্রিক রিটার্ন বিশ্লেষণের সময় এই ডিভিডেন্ড ও খরচ দুটিই হিসাব করতে
হবে।
দীর্ঘমেয়াদি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সফল কৌশল
দীর্ঘমেয়াদি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো স্বল্পমেয়াদি দামের
ওঠানামার পরিবর্তে ভালো কোম্পানি, ধারাবাহিক ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, যুক্তিসঙ্গত
মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ
অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, আর্থিক
পরিকল্পনা, ঝুঁকি-রিটার্ন এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ওপর
গুরুত্ব দেয়। তবে কোনো কৌশলই নিশ্চিত লাভের নিশ্চয়তা দেয় না; BSEC নিজেও
পুঁজিবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছে।
১. দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করুনঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে আপনি
কেন বিনিয়োগ করছেন এবং কত বছর বিনিয়োগ ধরে রাখতে চান তা নির্ধারণ করুন। সম্পদ
তৈরি, ভবিষ্যতের বড় খরচ বা অবসরকালীন সঞ্চয়ের মতো লক্ষ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের
পরিকল্পনা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে প্রতিদিন শেয়ারের দাম ওঠানামা
দেখে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কমে। BSEC-এর Investor Education
Program-এও Investment Planning, Financial Planning এবং Secondary Market
Investment-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২. মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানি বেছে নিনঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে
কোম্পানি নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। কোম্পানির রাজস্ব,
মুনাফা, EPS, ঋণ, নগদ প্রবাহ, NAV, ডিভিডেন্ড এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশ্লেষণ করুন। শুধু শেয়ারের দাম কম বা জনপ্রিয় হওয়ার কারণে বিনিয়োগ না করে
কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসা ও আর্থিক সক্ষমতা বোঝার চেষ্টা করুন। BSEC-এর বিনিয়োগ
শিক্ষা কার্যক্রমেও Securities Analysis এবং Investment Analysis-কে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৩. যুক্তিসঙ্গত দামে শেয়ার কেনার চেষ্টা করুনঃ ভালো কোম্পানি হলেই যেকোনো
দামে তার শেয়ার কেনা ভালো সিদ্ধান্ত নয়। কোম্পানির P/E, EPS growth, Dividend
Yield এবং অন্যান্য মূল্যায়ন সূচক বিবেচনা করে শেয়ারটির বর্তমান দাম
তুলনামূলকভাবে যুক্তিসঙ্গত কি না তা বিশ্লেষণ করুন। একই খাতের অন্যান্য কোম্পানির
সঙ্গে তুলনা করাও সহায়ক হতে পারে। অতিরিক্ত মূল্যায়িত শেয়ার কিনলে কোম্পানি
ভালো পারফর্ম করলেও প্রত্যাশিত রিটার্ন কম হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে
কোম্পানির গুণমানের পাশাপাশি কেনার মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য করুনঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে পুরো অর্থ একটি
কোম্পানি বা একটি খাতে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন কোম্পানি ও খাতে বিনিয়োগ
ছড়িয়ে দিলে কোনো একটি কোম্পানির খারাপ পারফরম্যান্সের প্রভাব কিছুটা কমানো যেতে
পারে। BSEC-এর বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমে Portfolio Management এবং
ঝুঁকি-রিটার্ন বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে Diversification-এর
অর্থ অসংখ্য শেয়ার কেনা নয়; বরং নিজের বিনিয়োগ লক্ষ্য অনুযায়ী পর্যাপ্তভাবে
ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া।
৫. ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করুনঃ একবারে পুরো বিনিয়োগযোগ্য অর্থ বাজারে না
ঢুকিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করা একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি হতে
পারে। এতে বাজারের নির্দিষ্ট একটি সময়ের দামের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কিছুটা
কমে। যেমন, বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত অর্থ কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে বিনিয়োগ
করা যায়। তবে এটি কোনো নিশ্চিত লাভের কৌশল নয় এবং বাজারের পরিস্থিতি ও
ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। BSEC-ও বিনিয়োগের আগে
আর্থিক পরিকল্পনা ও ঝুঁকি বোঝার ওপর গুরুত্ব দেয়।
৬. ডিভিডেন্ড ও মুনাফার ধারাবাহিকতা দেখুনঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে
কোম্পানির মুনাফা ও ডিভিডেন্ডের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো
কোম্পানি কয়েক বছর ধরে ব্যবসা ও মুনাফা স্থিতিশীলভাবে বৃদ্ধি করতে পারছে কি না,
ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা কেমন এবং ভবিষ্যতে সেই মুনাফা ধরে রাখার সম্ভাবনা আছে
কি না এসব বিষয় বিশ্লেষণ করুন। শুধু একটি বছরে বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানিকে
দীর্ঘমেয়াদে সেরা বিনিয়োগ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ব্যবসার স্থায়িত্ব ও নগদ
প্রবাহও পাশাপাশি বিবেচনা করা উচিত।
৭. নিয়মিত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করুনঃ শেয়ার কিনে বহু
বছর কোনো তথ্য না দেখে রেখে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সঠিক অর্থ নয়।
কোম্পানির বার্ষিক ও পর্যায়ক্রমিক আর্থিক ফলাফল, মুনাফা, EPS, ঋণ, নগদ প্রবাহ
এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট ঘোষণা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কোম্পানির মৌলিক
অবস্থায় বড় পরিবর্তন হলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
BSEC-এর Investor Education Program-এ বিনিয়োগ বিশ্লেষণ ও Portfolio
Management-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৮. বাজারের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামায় আতঙ্কিত হবেন নাঃ দীর্ঘমেয়াদি
বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো স্বল্পমেয়াদি বাজার অস্থিরতা সামলানোর
মানসিকতা তৈরি করা। কোনো ভালো কোম্পানির শেয়ার সাময়িকভাবে কমে গেলেই আতঙ্কিত
হয়ে বিক্রি করার পরিবর্তে প্রথমে দাম কমার কারণ বিশ্লেষণ করুন। কোম্পানির ব্যবসা
ও আর্থিক ভিত্তি ঠিক থাকলে সাময়িক বাজার পতন এবং কোম্পানির মৌলিক অবনতি এই দুই
বিষয়কে আলাদা করে দেখা দরকার। তবে মৌলিক সমস্যা দেখা দিলে শুধু দীর্ঘমেয়াদি
বিনিয়োগ” বলে শেয়ার ধরে রাখাও যুক্তিযুক্ত নয়।
৯. গুজব ও নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলুনঃ দীর্ঘমেয়াদি
বিনিয়োগে গুজবের পরিবর্তে যাচাইযোগ্য তথ্য ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো শেয়ার দ্রুত বাড়বে, নিশ্চিত লাভ হবে বা কোনো গোপন
খবর আছে এ ধরনের দাবির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। BSEC-এর
Financial Literacy Program বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন বিনিয়োগের সুযোগ ও ঝুঁকি
মূল্যায়ন করার জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয়। তাই কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও
নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
১০. ঋণ নিয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করবেন নাঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য
এমন অর্থ ব্যবহার করা ভালো যা বিনিয়োগকারী দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারবেন।
অতিরিক্ত ঋণ বা উচ্চ ঝুঁকির অর্থ ব্যবহার করলে বাজারের পতনের সময় আর্থিক চাপ
বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগের অর্থ যদি নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দেওয়ার
বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে বাজার কমে যাওয়ার সময় ক্ষতিতে শেয়ার বিক্রি করার চাপ
তৈরি হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রয়োজন এবং ঝুঁকি
গ্রহণের ক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত।
১১. ধৈর্য ধরে Compounding-এর সুবিধা কাজে লাগানঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের
একটি বড় সম্ভাবনা হলো Compounding বা চক্রবৃদ্ধি প্রভাব। বিনিয়োগ থেকে পাওয়া
ডিভিডেন্ড বা অন্যান্য রিটার্ন পুনরায় বিনিয়োগ করলে সময়ের সঙ্গে মূলধন বৃদ্ধির
সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাস্তবে রিটার্ন প্রতি বছর একই থাকবে এমন নিশ্চয়তা
নেই। তাই Compounding-কে নিশ্চিত লাভ হিসেবে না দেখে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগের
সম্ভাব্য সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিয়মিত সঞ্চয় ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বিনিয়োগ
দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
১২. নিয়মিত পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করুনঃ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ মানে
শেয়ার কিনে একেবারে ভুলে যাওয়া নয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর পোর্টফোলিও পর্যালোচনা
করে দেখুন কোম্পানির ব্যবসা আগের মতো শক্তিশালী আছে কি না, মুনাফা ও নগদ প্রবাহের
অবস্থা কেমন, ঋণ বাড়ছে কি না এবং শেয়ারের মূল্যায়ন অতিরিক্ত হয়ে গেছে কি না।
BSEC-এর Investor Education Program-এ Portfolio Management-কে বিনিয়োগ শিক্ষার
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের মন্তব্যঃ বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করার আগে বিষয়টিকে শুধু দ্রুত লাভের
মাধ্যম হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
আমার মতে, নতুন বিনিয়োগকারীর প্রথম কাজ হলো বাজারের কার্যক্রম, BO Account,
ব্রোকারের ভূমিকা, শেয়ার কেনাবেচা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া।
BSEC-এর বিনিয়োগ নির্দেশিকাতেও ব্রোকারের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা, অর্ডার
দেওয়া এবং লেনদেনের নথি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির ব্যবসা, মুনাফা, EPS, ঋণ, নগদ প্রবাহ, ডিভিডেন্ড এবং
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করা উচিত। অন্যের টিপস, গুজব বা দ্রুত লাভের আশায়
বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সব অর্থ একটি শেয়ারে না
রেখে নিজের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী পোর্টফোলিও তৈরি করা ভালো। BSEC-এর
Investor Education Program-এও বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, ঝুঁকি-রিটার্ন এবং পোর্টফোলিও
ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে, মনে রাখতে হবে শেয়ার বাজারে লাভ যেমন সম্ভব, তেমনি মূলধন হারানোর ঝুঁকিও
রয়েছে। তাই বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও লক্ষ্য বিবেচনা করুন,
নিয়মিত কোম্পানির তথ্য পর্যবেক্ষণ করুন এবং প্রতিটি লেনদেনের Order
Confirmation, Trade Confirmation ও Contract Note সংরক্ষণ করুন। আমার পরামর্শ
হলো আগে শিখুন, তারপর বিনিয়োগ করুন। আশা করছি, এই আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার নিয়ম সম্পর্কে আপনার একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি
হয়েছে।

বিডি টেকল্যান্ডের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url